তৃণমূল রাজনীতিতে নারীর ক্ষমতায়নে উজ্জ্বল রাজাপুর ইউনিয়ন

নারীর ক্ষমতায়নের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হলো রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন, যা প্রায়শই রয়ে যায় আমাদের মনোযোগের অন্তরালে৷ বাংলাদেশের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে নারী নেতৃত্ব থাকলেও, রাজনীতিতে নারীর সমান নেতৃত্ব মূলত এখনো বহু দূরের যাত্রা। বাংলাদেশের সরকার প্রধান নারী, জাতীয় সংসদের বিরোধী দলীয় নেতৃত্ব ও স্পিকার নারী, প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের প্রধানও দুজন নারী। তবু বাংলাদেশের রাজনীতির তৃণমূল পর্যায়ের রাজনীতিতে হয়নি নারীর ক্ষমতায়ন৷ বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোতে নারীর অংশগ্রহণ রয়েছে শুধুমাত্র নারী সহযোগী সংগঠনের মাধ্যমে। অন্যান্য ক্ষেত্রে অংশগ্রহণ রয়েছে নামে মাত্র।। অনেকেই মনে করেন নারী রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করবে শুধুমাত্র নারী সংগঠনের মাধ্যমে। আর তারই অজুহাতে অনেক ক্ষেত্রেই মূলদলে নারীরা হন বঞ্চিত আর সেখান থেকেই রাজনৈতিক নেতৃত্বে পিছিয়ে পড়েন তারা।

গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশ (সংশোধন) ২০০৮ এর ৯০ এর (খ) ধারায় বাংলাদেশের প্রতিটি রাজনৈতিক দল এর সকল স্তরে অন্ততঃ ৩৩ শতাংশ নারী ২০২০ সালের মাঝে অন্তর্ভূক্ত করার আইন রয়েছে। বর্তমান সংশোধনীর জন্যে সময়সীমা বাড়ানোর প্রস্তাবনা বিবেচনাধীন রয়েছে। জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতিমালা ২০১১ -এ ৩২ নং ধারায় নয়টি পয়েন্টে নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের জন্য যে নীতিমালা রয়েছে, সেখানেও রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরে পর্যায়ক্রমে ৩৩ শতাংশ নারী প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার উল্লেখ রয়েছে। (৩২.৩, জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতিমালা)। বাংলাদেশের সংবিধানের ২৮ নং অনুচ্ছেদে রাষ্ট্র লিঙ্গভেদে বৈষম্য করতে পারবে না মর্মে উল্লেখ আছে। এরূপ জাতীয় নানান নীতি ও আইন রয়েছে ঠিকই, কিন্তু এর বাস্তব প্রয়োগে রয়েছে নানাবিধ প্রতিকূলতা, যার ফলে নারীরা এখনো উল্লেখযোগ্যভাবেই পিঁছিয়ে আছে রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে।

বর্তমানে মূলদলের সকল কমিটিতে ৩৩ শতাংশ বা তার কাছাকাছি নারী বাংলাদেশের কোন রাজনৈতিক দলেই নেই। তাই সাম্প্রতিক বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ -এর রাজাপুর উপজেলার মূলদলের কমিটিগুলোতে ব্যাপক সংখ্যক নারী অন্তর্ভূক্তি এক পরিবর্তনের আশার সূচনা করেছে৷

রাজাপুর উপজেলায় ৭১ সদস্যের কমিটিতে মোট ১১ জন নারী নির্বাচিত হয়েছেন, অর্থাৎ ১৫.৫ শতাংশ। তাদের মাঝে আফরোজা আক্তার লাইজু নিযুক্ত হয়েছেন সহ-সভাপতি পদে। এ উপজেলা কমিটি ঝালকাঠি জেলার সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক দ্বারা স্বাক্ষরিত হয়েছে এ বছরের ১৮ জানুয়ারি। রাজাপুরের মূলদলের সকল কমিটি একটি বই আকারে প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, রাজাপুর উপজেলা। ঝালকাঠি জেলার রাজাপুর উপজেলায় রয়েছে মোট ৬টি ইউনিয়ন এবং প্রতিটি ইউনিয়নে ৯টি করে সর্বমোট ৫৪ টি ইউনিয়ন ওয়ার্ড। ইউনিয়নগুলোতে গড়ে নারী অন্তর্ভূক্তি ঘটেছে ১৩ শতাংশের অধিক এবং ইউনিয়ন ওয়ার্ডগুলিতে ১৫ শতাংশের অধিক। এগুলোর অনেকগুলোরই পূর্বের কমিটিতে শুধুমাত্র একজন “নারী বিষয়ক সম্পাদক” ব্যতিত নারী সদস্য ছিল না। এই ব্যাপক নারী অন্তর্ভূক্তি কেবল রাজাপুর উপজেলায়ই নয়, বরং ঘটেছে ঝালকাঠি জেলার বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ -এর প্রতিটি স্তরে। রাজাপুর উপজেলার মঠবাড়িয়া ইউনিয়নের ২ নং ওয়ার্ডের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন একজন নারী, তাসলিমা আবিদা, যা এ অঞ্চলের রাজনৈতিক ইতিহাসে শুধু প্রথমই নয়, চমকপ্রদও বটে। তিনি বিগতবারের পুরুষ সভাপতির সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে নির্বাচিত হন। এক্ষেত্রে পূর্ণাঙ্গ সহযোগিতা করেছেন আফরোজা আক্তার লাইজু।

উল্লেখ্য, ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনাল প্রায় ১০ বছর ধরে ঝালকাঠি জেলাসহ বাংলাদেশের অনেক জেলায় তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে। ইউএসএআইডি এবং ইউকেএইড -এর অর্থায়নে “নারীর জয়ে, সবার জয়” ক্যাম্পেইনের আওতায় নারী নেতৃত্ব প্রসারে ও রাজনীতিতে নারীর ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে কাজ করছে| ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশাল গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশ অনুযায়ী সকল দলের সকল কমিটিতে ৩৩ শতাংশ নারী অন্তর্ভূক্তির আইনের বাস্তবায়নে নানান ধরণের কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। সারা দেশে যোগ্য নারী নেতাদের তালিকা প্রস্তুত করা হয় নারী নেতাদের মাধ্যমেই। তার জন্য প্রতিটি দলের নারী নেতৃদের নিয়ে তৈরি করা হয় স্টিয়ারিং কমিটি। ঝালকাঠি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের স্টিয়ারিং কমিটির আহ্বায়কের দায়িত্ব পালন করেন ঝালককাঠি জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য এবং মহিলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ইসরাত জাহান সোনালী এবং সে কমিটির রাজাপুর উপজেলার দায়িত্বে ছিলেন আফরোজা আক্তার লাইজু। স্থানীয় নেতৃত্বের ইতিবাচক মনোভাব এবং নারী নেতৃবৃন্দের প্রচেষ্টায় ওয়ার্ড পর্যায়ে মূলদলের কমিটিতে নারীর অন্তর্ভুক্তি ঘটেছে।

লিঙ্গ বৈষম্য, শিক্ষা ও সচেতনতার অভাব, নিরাপত্তার অভাব, নারীদের অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা না থাকা, রাজনীতির অভ্যন্তরে রাজনীতিকরণ, তৃণমূল রাজনীতিতে পেশীশক্তির প্রভাব ইত্যাদি নানান কারণে হচ্ছে না নারীদের প্রকৃত রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন। নারীদের রাজনীতিতে নানান প্রতিবন্ধকতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়, যে কারণে অনেক নারীরা রাজনীতিতে অগ্রসর হন না, আবার অনেকেই চেষ্টা ও যোগ্যতা থাকা সত্বেও নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে যেতে পারেন না। নানান প্রতিকূলতার পরও আশার আলোও একদম ক্ষীণ নয়। রাজাপুরের বিষয়টি সারা দেশে রাজনৈতিক দলগুলোর মাঝে দৃষ্টান্ত হিসেবে কাজ করবে আশা রাখছি।

পরিবর্তন আসবেই।

প্রবন্ধ লেখকঃ  প্রতিভা শারমিন, প্রোগ্রাম অফিসার, ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনাল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *