প্রযুক্তিনির্ভর জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা (TFGBV) নারীর অর্থবহ ও নিরাপদ রাজনৈতিক অংশগ্রহণের পথে অন্যতম বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই সহিংসতা প্রতিরোধে কার্যকর আইনি সুরক্ষার দাবিতে জনমত গঠন, সচেতনতা ক্যাম্পেইন ও সংবাদ সম্মেলনসহ নানা উদ্যোগ নিয়েছে ঢাকা মাল্টিপার্টি অ্যাডভোকেসি ফোরাম (এমএএফ)। ফোরামের সদস্যরা সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬-এ TFGBV সম্পর্কিত বিদ্যমান ঘাটতিগুলো বিশ্লেষণ করে একটি বিস্তারিত সুপারিশমালা প্রস্তুত করেছেন, যা সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও অংশীজনের কাছে হস্তান্তর করেছে ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনাল ও এমএএফ’র প্রতিনিধি দল।
প্রযুক্তিনির্ভর সহিংসতা প্রতিরোধে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন চালিয়ে যাচ্ছেন এমএএফ সদস্যরা। যার অংশ হিসেবে গত ২০ আগস্ট নগরীর কবি নজরুল সরকারি কলেজে ও ২৩ আগস্ট নর্দান বিশ্ববিদ্যালয়ে TFGBV প্রতিরোধ এবং ‘সাইবার সুরক্ষা আইন’ সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের মতামত এবং সচেতনতা বিষয়ক ক্যাম্পেইন অনুষ্ঠিত হয়।
ক্যাম্পেইনে শিক্ষার্থীদের অনলাইন নিরাপত্তা সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রেজেন্টেশনে ডিপফেক, ডক্সিং, সেক্সটরশন, সাইবারস্টকিং ও সাইবারফ্ল্যাশিংসহ বিভিন্ন ধরনের অনলাইন হয়রানি এবং কীভাবে ফোনের মাধ্যমে নজরদারি চালিয়ে হয়রানি করা হয়, তা তুলে ধরা হয়। পাশাপাশি এসব থেকে মুক্তি পাওয়ার উপায় ও প্রস্তাবিত আইনে গৃহীত সুপারিশসমূহ সম্পর্কেও আলোচনা করা হয়। ক্যাম্পেইনে শিক্ষার্থীরা অনলাইন নিরাপত্তা ও সচেতনতা নিয়ে নিজেদের মতামত জানান। নর্দান বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিল্ম এন্ড ফটোগ্রাফি ক্লাব, বিজনেস এন্টারপ্রেণারশিপ এন্ড লিডারশিপ ক্লাব, সেন্ট্রাল এথিকাল ক্লাব ও সাংবাদিক সমিতির যৌথ উদ্যোগে ক্যাম্পেইনে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা অংশ নেন। এসময় ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীরা তাদের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন।
এছাড়াও, সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬ সংশোধনের আহ্বান জানিয়ে গত ২৪ আগস্ট জাতীয় প্রেস ক্লাবে একটি সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে এমএএফ। সংবাদ সম্মেলনে আইন সংস্কারে ছয় দফা সুপারিশ তুলে ধরেন ফোরামের সদস্যরা। সুপারিশগুলোর মধ্যে রয়েছে—TFGBV’র সুস্পষ্ট আইনি সংজ্ঞা নির্ধারণ, অনলাইন সহিংসতা মোকাবিলায় সুনির্দিষ্ট বিধান সংযোজন, নিরাপদ ও সহজলভ্য অভিযোগ ব্যবস্থাসহ ভুক্তভোগীর পরিচয়ের গোপনীয়তা নিশ্চিত করা, ক্ষতিকর কনটেন্ট দ্রুত অপসারণ ও ডিজিটাল প্রমাণ সংরক্ষণের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং ক্ষতিপূরণসহ দ্রুত ও কার্যকর আইনি প্রতিকারের ব্যবস্থা করা।
সংবাদ সম্মেলনে অংশ নেন সংসদ সদস্য সুলতানা জেসমিন জুঁই ও নাদিয়া পাঠান পাপন। তারা সাইবার সুরক্ষা আইনে TFGBV অন্তর্ভুক্তির সুপারিশগুলোর সাথে একমত পোষণ করেন।
এসময় সংসদ সদস্য সুলতানা জেসমিন জুঁই বলেন, অনলাইনে হয়রানি, বুলিং, ডক্সিং, কিংবা ডিপফেইক কনটেন্ট শেয়ার করার আগে কেউ কি ভাবে যে, এই ঘটনাটা আমার সাথে ঘটলে কেমন লাগবে? নাগরিক হিসেবে আমাদের সকলের এই সমানুভূতির জায়গাটার উন্নয়ন প্রয়োজন। তাহলে অপরাধগুলো কমে আসবে। তিনি আরও বলেন, অনলাইনে সহিংসতা একটি সামাজিক সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই সমস্যার সমাধান মূলত আমরাই করতে পারি। দেশে অনেক আইন আছে, সেই আইনগুলোর যথাযথ প্রয়োগে দায়বদ্ধতা ও জবাবদিহিতার জন্য নাগরিক হিসেবে আমাদের কথা বলতে হবে। আমাদের দায়িত্ব ও অধিকারের বিষয়ে আমাদের সমানভাবে সচেতনতা জরুরি।
সংসদ সদস্য নাদিয়া পাঠান পাপন বলেন, সকল শ্রেণি-পেশার নারী বিভিন্নভাবে সাইবার বুলিং ও হেনস্তার শিকার হচ্ছেন; নারী এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলেই তা বিশ্রীভাবে উপস্থাপন করা হয়, এই দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন প্রয়োজন। তিনি এমন একটি আইন চান, যা নাগরিকদের কথা বলার সীমা মনে করিয়ে দেবে—সমালোচনা হবে গঠনমূলক উপায়ে, আক্রমণ করে নয়। তিনি আরও বলেন, নারীরা অনলাইনে সহিংসতার শিকার হলে তাদের পরিবারও শঙ্কিত হয়ে পড়ে, যা তাদের এগিয়ে যাওয়ার পথে বাধা তৈরি করে; দেশের অর্ধেকেরও বেশি জনগোষ্ঠী নারী হওয়ায় তাদের অবজ্ঞা, অবহেলা ও আক্রমণের শিকার করতে থাকলে তা জাতীগতভাবেই পিছিয়ে দেবে।
সেইসঙ্গে, গত ৯ আগস্ট আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান, ২৩ আগস্ট ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম, ৩০ জুলাই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাননীয় প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ, এবং ২৫ আগস্ট তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের মাননীয় প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এমএএফ এবং ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনালের প্রতিনিধি দল। এসময় তারা সাইবার সুরক্ষা আইনের সংশোধনের জন্য সুপারিশমালাটি হস্তান্তর করেন।
মাল্টিপার্টি অ্যাডভোকেসি ফোরাম বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দের সমন্বয়ে গঠিত একটি বহুদলীয় প্ল্যাটফর্ম। আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনালের বি-স্পেস প্রকল্পের আওতায় এসব কর্মসূচী পরিচালনা করছে এই প্ল্যাটফর্ম। প্রকল্পটি যুক্তরাজ্যের ফরেন, কমনওয়েলথ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অফিসের (এফসিডিও) অর্থায়নে পরিচালিত হচ্ছে।
কারণ বাংলাদেশ আমার কারণ বাংলাদেশ আমার